1. admin@somoyerahoban.com : somoyerahoban :
বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৯:০৮ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে সংগঠিত হয়েছিল জাতীয় মুক্তি বাহিনী

অবনী অনিমেষ,নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২০
  • ৬৭ Time View
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ময়মনসিংহে গঠন করা হয়েছিলো ‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’। ৩ শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে বাছাই করা ৭ হাজার যুবক ও ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয় ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী বিশেষ এই বাহিনী। দীর্ঘ ১৯ মাস ভারতে অবস্থান করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যায় বীরত্বগাঁথা এ বাহিনী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রথম ঘোষণা দেওয়া হয়েছিলো ময়মনসিংহ থেকেই। মানুষ এখনও এই বাহিনীকে চিনে ‘কাদেরিয়া বাহিনী’ নামে। নানান কারণে এখনও অবহেলিত বিশেষ এই বাহিনীর বীর যোদ্ধা ও তাদের পরিবার। পরিবার নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন ‘প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদ’র বহু সদস্য। বীর যোদ্ধা ও তাদের স্ত্রী-সন্তানরা সরকারের সকল সুযোগ-সুবিধা এবং প্রাপ্য সম্মান চান। অন্যদিকে বহু আগে সংগঠনের কয়েক সদস্যের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে সরকারের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন হাজার হাজার পরিবার। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গত মার্চ মাসে ‘প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদ’র ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের আলোচনা হওয়ার কথা ছিলো। রাষ্ট্রীয় এবং করোনা পরিস্থিতির কারণে ২ বার সাক্ষাত স্থগিত করা হয়। কলঙ্কময় ১৫ আগস্ট এবং পরবর্তী সময় নিয়ে রবিবার কথা হয় প্রতিমন্ত্রী, বিভিন্ন আসনের এমপি, কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগ নেতার সাথে। তারা সবাই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
জানা যায়, এরশাদ সরকারের শেষ সময়ে ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করে বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকীসহ অন্যদের দেশে ফিরিয়ে আনেন। পরে প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়ানোর কারণে শেখ হাসিনার সাথে আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর দূরত্ব সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার ঘটনায় কাছের সহযোগীদের সাথেও তার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। ১৯৯৭ সালে ‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’ বিলুপ্ত ঘোষণা করে গঠন করা হয় ‘প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদ’। বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী বীর যোদ্ধাদের অনেকেই মানবেতর জীবন-যাপন করছিলেন। পরিবার নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছিলো তাদের। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে গর্জে উঠা এ বাহিনীর অনেক সদস্যের এখন পর্যন্ত নাম নেই মুক্তিযোদ্ধা তালিকায়। আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে ‘প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদ’ সদস্যদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ত্রাণ ও পুনর্বাসন সেল খোলা হয়। এখন পর্যন্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন ৪ হাজারেরও বেশি বীর যোদ্ধা। পর্যায়ক্রমে অনেকেই ২০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ সহায়তা পেয়েছেন। জটিলতা নিরসন হলেই ‘প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদ’ সদস্যরা সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা এবং মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থান পাবেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ময়মনসিংহে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো। ইতিহাসের কলঙ্কময় এই হত্যাকাণ্ডের খবর পৌঁছার পরই ময়মনসিংহ শহর নিস্তব্ধ হয়। হতভম্ব হন সর্বস্তরের মানুষ। অঘোষিত কারফিউ জারি থাকায় সৃষ্টি হয় ভূতুড়ে পরিবেশ। নামানো হয় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ও পুলিশ। গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সিনিয়র নেতারা। গ্রেফতার হন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক ধর্মমন্ত্রী আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অর্ধশত নেতা। তাদের অনেককেই আটকাদেশ (ডিটেনশন) দিয়ে পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়ানো হয়। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সবাই মুক্তি পান। একই সময় সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। পরে তাকে অন্য কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’র অন্যতম সেক্টর কমান্ডার বর্তমানে প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর দেলোয়ার হোসেন এই প্রতিবেদক কে বলেন, সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া হয়েছিলো ময়মনসিংহের মাটি থেকেই। গর্জে উঠেছিলো এ অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ৩ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে বাছাই করা ৭ হাজার যুবক ও ব্যক্তিকে নিয়ে গঠন করা হয়েছিলো ‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’। বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কাদের সিদ্দিকী সুযোগ খুঁজতে থাকেন। সাহসী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে নভেম্বর মাসের শুরুতে তিনি ময়মনসিংহ শহরে আসেন। বৈঠক করেন রেবতী মোহন চক্রবর্তী ও সুধীর চন্দ্র দাসসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে। পরে হালুয়াঘাট সীমান্তের গোবড়াকুড়ায় আমাদের সাথে বৈঠক করেন। কাদের সিদ্দিকী হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ি ও ঝিনাইগাতী সীমান্তে অবস্থানের পর আমাদের নিয়ে ওপারে চলে যান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ২ বার ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক করে ফিরে আসেন। তৃতীয় বার বৈঠকের পর ভারত সরকারের সহযোগিতায় শুরু হয় ‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’র কর্মকাণ্ড।
জানা যায়, ৩টি সেক্টরে বিভক্ত ছিলো ‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’। টাঙ্গাইলের আনোয়ারুল হক সেলিম তালুকদার নেত্রকোনা সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের ভবানীপুরে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের মীর দেলোয়ার হোসেন ময়মনসিংহ সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের ডুমনি কুড়ায় এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দার সুকুমার সরকার নেত্রকোনা সীমান্তের মেঘালয়ের মহাদেও-এ অবস্থান করে ৩টি সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। হালুয়াঘাট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার কবিরুল ইসলাম বেগ হেডকোয়ার্টার কমান্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। আনোয়ারুল হক সেলিম তালুকদার ‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’র সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন। এখন তিনি ‘প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদ’র কেন্দ্রীয় সভাপতি। তৎকালীন সময়ে ঢাকা ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া দুর্গাপুর-কলমাকান্দা আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মানু মজুমদার সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। মীর দেলোয়ার হোসেন সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্যের পাশাপাশি ময়মনসিংহ বিভাগে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মীর দেলোয়ার হোসেন জানান, সুনামগঞ্জ থেকে কুড়িগ্রাম জেলার ওপারে দেড় শতাধিক অস্থায়ী ক্যাম্প করে আমরা দীর্ঘ ১৯ মাস বিডিআরের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাই। প্রতিদিনই দীর্ঘ ৩২২ কিলোমিটার সীমান্তের একাধিক পয়েন্টে বিডিআরের সাথে আমাদের যুদ্ধের ঘটনা ঘটতো। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের মে মাস পর্যন্ত আমরা ভারতে অবস্থান করে ৩২২ কিলোমিটার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে রাখি। ১৯ মাসের যুদ্ধে আমাদের বাহিনীর ২ শতাধিক সদস্য শহীদ হন। ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনার পর ১৯৭৭ সালে যুদ্ধ বিরতি চুক্তির মাধ্যমে ‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’র সদস্যদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। অনেকেই পালিয়ে ভারত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, আব্দুল কাদের সিদ্দিকীসহ আমরা ২২ জন ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেই। অন্যদিকে চুক্তি অনুযায়ী বাহিনীর সদস্যদের পুনর্বাসন না করে ৫ শতাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক রাখা হয়। সামরিক আদালত গঠন করে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ নন্দীসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। তৎকালীন সেনা প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বিশ্বজিৎ নন্দীর ফাঁসির দণ্ড মওকুফ করেন।
‘প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদ’র নেতা মুক্তিযোদ্ধা স্বপন চন্দ বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবেসেছিলাম বলেই আমরা মহান এ নেতার ডাকে সাড়া দিয়ে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। দেশ স্বাধীনের সাড়ে ৩ বছরের মাথায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি সপরিবারে নৃশংসভাবে শহীদ হন। ইতিহাসের জঘন্যতম এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে আমরা আবারও যুদ্ধে নামি। সংগঠনের অন্যতম নেতা পরিমল চন্দ্র সাহা বলেন, আমরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যুদ্ধে যুদ্ধে দীর্ঘ ১৯ মাস কাটিয়ে দেই। আমরা প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদের সদস্যরা প্রাপ্য সম্মানটুকু নিয়ে বাঁচতে চাই। যারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তারা তো রাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার দাবি রাখেন।
‘প্রতিরোধ যোদ্ধা সন্তান পরিষদ’র মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোঃ বাকি বিল্লাহ লিঠু জানান, ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষ বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছিলেন বলেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে দীর্ঘ ১৯ মাস যুদ্ধ করেছেন। সেই সব বীর যোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা এখনও অবহেলিত। অনেক পরিবারেই রয়েছে চরম অর্থ সঙ্কট। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তাদের। সরকার যদি এই সব যোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা এবং প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয় তাহলে পরিবারগুলো ভালোভাবে দিন কাটাতে পারবে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
কপিরাইট © 2020 somoyerahoban.com একটি স্বপ্ন মিডিয়া সেন্টার প্রতিষ্ঠান।